প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতেই প্রতিবন্ধী জান্নাতীকে গণধর্ষণের পর হত্যা

196

01প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভার মর্দনায় গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিলো প্রতিবন্ধি কিশোরী জান্নাতী খাতুনকে। হত্যাকান্ডের প্রায় ৬ মাস পর এই হত্যাকান্ডের রহস্য রহস্য উদঘাটন করে ৬ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে শিবগঞ্জ থানা পুলিশ। কিন্তু ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী একাধিক বিস্ফোরক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী শিবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সালাম ও নিহত জান্নাতীর বাবা মোঃ আলমের নাম অভিযোগপত্রে না থাকায় ফুঁসে উঠেছেন এলাকার মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত শিবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে ৯ নং ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সালামকে পরাজিত করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা খাইরুল আলম জেম। এর আগে জেমের বড় ভাই শফিকুল ইসলাম পাশবানকে হারিয়ে দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন সালাম। এলাকাবাসীর অভিযোগ এবারের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সালাম। এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে তার সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে এলাকার মানুষ।
সর্বশেষ গত বছরের ১৬ অক্টোবর ওই এলাকায় গণধর্ষনের পর হত্যা করা হয় সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সালামের সমর্থক মোঃ আলমের প্রতিবন্ধী মেয়ে জান্নাতী খাতুনকে। ওই দিন সকালে বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দুরে একটি আখ ক্ষেতের মধ্য থেকে জান্নাতির বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় নিহত জান্নাতির বাবা মোঃ আলম বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর খাইরুল আলম জেমের দুই কর্মী ইসমাইল ও তৌহিদ আলী কে আসামী করে শিবগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পুলিশী তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ঘটনার প্রকৃত রহস্য। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে কিশোরী জান্নাতীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা বলে সম্প্রতি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে জান্নাতীর বাবার দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামীকে অব্যাহতি দিয়ে সাবেক কাউন্সিলর সালামের ৬ সমর্থককে আসামী করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের বিশদ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বাদশা নামের এক আসামী ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী দিয়েছে আদালতে। মামলার অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই নেতা বর্তমান কাউন্সিলর জেমের সঙ্গে সাবেক কাউন্সিলর সালামের বিরোধ চলে আসছে। বিরোধের জের ধরে রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যাক্তি খুন হন। আর এই হত্যাকান্ডে আসামী করা হয় বর্তমান কাউন্সিলর জেমসহ তার অনুসারীদের। এই মামলায় মিমাংসার জন্য ১০ লাখ টাকা নেয়ার পরও তালবাহানা করায় সালাম কাউন্সিলরের লোকজনকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করে স্থানীয় গ্রাম রক্ষা কমিটি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মর্দনা গ্রামের বাদশা, রকিব, বাবু, পিন্টু, আলী সাহেব ও শামীম প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে একটি হত্যাকান্ড ঘটানোর পরিকল্পনা নেয়। এজন্য ঘটনার কয়েকদিন আগে আসামীরা রানীহাটি বাজারের পিছনে একটি স্থানে বৈঠকে বসে জন্নতী খাতুনকে হত্যার ছক আটে। পরিকল্পনা মোতাবেক ২০০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে জান্নাতী খাতুন নামের ওই প্রতিবন্ধী কিশোরীকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে পাশ্ববর্তী আখের ক্ষেতে গণধর্ষনের পর হত্যা করে তারা। পরে পরিকল্পনা মোতাবেক মামলার আসামী করা হয় জেমের সমর্থকদের নামে।
এদিকে অভিযোগপত্রে ওই ঘটনার মুল পরিকল্পনাকারী সাবেক কাউন্সিলর সালাম ও নিহত জান্নাতীর বাবা আলমের নাম না থাকায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন এলাকার মানুষ। এর প্রতিবাদে এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। এলাকাবাসীর দাবী, গ্রামবাসীকে ফাঁসাতেই ঘটানো হয় পরিকল্পিত এই হত্যাকান্ড। এর সঙ্গে সাবেক কাউন্সিলর সালাম ও জান্নাতীর বাবা আলমও জড়িত। অথচ তাদের নাম মামলার অভিযোগ পত্রে নেই। মর্দনা গ্রামের রুহুল আমিন, শহিদুল ইসলাম, রনি মিয়া, মতিরুল ইসলাম, বাহাদুরসহ আরো অনেকে অভিযোগ করে বলেন, সালাম কাউন্সিলরের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়ে জান্নাতীকে সন্ত্রাসীদের কাছে তুলে দেয় জান্নাতীর বাবা মোঃ আলম। এরপর তাকে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। জান্নাতীর বাবা আলমের বিরুদ্ধে এর আগেও একই কায়দায় তার ভাইকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। অথচ মামলার রহস্য উদঘাটিত হলেও সালাম ও আলমকে মামলার আসামী করা হয়নি। তারা আরো বলেন সাবেক কাউন্সিলর সালাম একাধিক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী হলেও পুলিশ তাকে ধরছে না। মামলাটি পূনরায় তদন্ত করে ঘটনার মুল পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর খাইরুল আলম জেমেরও দাবী প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক। তিনি সিআইডকে দিয়ে মামলাটি পুনরায় তদন্তের দাবী জানিয়েছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শিবগঞ্জ থানার তৎকালিন ওসি(তদন্ত) সারওয়ার রহমান জানান, এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করার লক্ষে এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। মামলার বাদি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে সে অভিযোগ তদন্তে প্রমানিত না হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এই ঘটনার দায় স্বীকার করে আসামী বাদশা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দীও দিয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরো জানান, এখন মামলার চার্জশিট দেয়ার পরে অনেক কথা শুনা যাচ্ছে। তবে আমার তদন্তকালিন সময়ে সালাম ও বাদির নাম আসেনি।