জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম

    41

    ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট : দেশের তৃতীয় ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে এবার নিবন্ধিত হতে যাচ্ছে সুমিষ্ট আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘খিরসাপাত’ আম। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখন শেষের পথে। এসংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এর ফলে এখন থেকে এই আম বিশ্বজুড়ে শুধু ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম নামে পরিচিতি পাবে। এদিকে ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে খিরসাপাত নিবন্ধিত হতে যাওয়ায় চরম আনন্দিত জেলার আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা। এরফলে বিশ্ববাজারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
    আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে আড়ইশ জাতের আম চাষ হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় জাত হচ্ছে খিরসাপাত। জেলার বাইরে এই আম হিমসাগর নামে পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত আমের মধ্যে একটি বড় অংশ দখল করে আছে খিরসাপাত জাতের আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫টি উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া সুস্বাদু এই জাতের আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে গত তিনবছর ধরে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। অবশেষে এই আমের স্বত্ব সুরক্ষার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও আঞ্চলিক উদ্যাণতত্ব গবেষণা কেন্দ্র। এরই অংশ হিসেবে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘খিরসাপাত, ন্যাংড়া ও আশ্বিণা আমকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করে সংস্থাটি। কিন্তু প্রথমে খিরসাপাত আমকেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে।
    খিরসাপাতের যে সব বৈশিষ্ট বিবেচনায় এনে আবেদন করা হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত খুবই জনপ্রিয় বাণিজ্যিক জাতের আম। এই ফল মাঝারি আকারের এবং অনেকটা ডিম্বাকৃতির। গড়ে লম্বায় ৮.৬ সেঃ মিঃ এই আমের ওজন হয় ২৬৩.৯ গ্রাম। পাঁকা ফলের ত্বকের রং সামান্য হলদে এবং শাঁসের রং হলুদাভ। শাঁস আঁশবিহীন, রসাল, গন্ধ আকর্ষণীয় ও বেশ মিষ্টি। গড় মিষ্টতা ২৩%। জ্যৈষ্ঠ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বাজারে পাওয়া যায় এই খিরসাপাত আম।
    অবশেষে আবেদনের প্রায় একবছর পর এই আমের ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণাদি যাচাই বাছাই শেষে ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম’ নামে নিবন্ধন দিতে যাচ্ছে পেটেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে এসংক্রান্ত গেজেট ছাপার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিজি প্রেসে পাঠিয়েছে পেটেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর।এরপর এব্যাপারে কারও কোন আপত্তি থাকলে তা শোনার জন্য গেজেট ছাপানোর তারিখ থেকে ৬০ দিন অপেক্ষা করা হবে। তারপরেই মিলবে নিবন্ধন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ইলিশ ও জামদানীর পর দেশের তৃতীয় ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হতে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত ‘খিরসাপাত’ আম। এতে করে দারুন খুশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ব্যবসায়ীরা।
    সদর উপজেলার গোহালবাড়ীর আমচাষী সাইদুর রহমান জানান, এই নিবন্ধনের ফলে খিরসাপাত শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এতে করে দেশের অভ্যান্তরে ও বিশ্ববাজারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের চাহিদা বাড়বে। ফলে উপকৃত হবেন জেলা আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা।
    কানসাটের আমব্যবসায়ী আকবর হোসেন জানান, গত কয়েকবছর ধরে খিরসাপাত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এরফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত খিরসাপাত আমের চাহিদা আরো বাড়বে।
    বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিউসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ জানান, দেশের সিংহভাগ সুমিষ্ট আম উৎপাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। অথচ বিভিন্ন জেলায় উৎপাদিত নি¤œমানের আমকে এতদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হিসেবে বাজারজাত করে আসছিল প্রতারকরা। এতে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সুনাম নষ্ট হচ্ছিল। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘খিরসাপাত’ আম নিবন্ধন পেলে সেই প্রতারনা বন্ধ হবে। বিশ্ববাজারেও বাড়বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের চাহিদা। এতে অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা।
    চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফলবিজ্ঞানী ড. শরফ উদ্দিন জানান, আবেদনের পর এই একবছরে অনেক কিছু যাচাই বাছাই করা হয়েছে। এখন ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে খিরসাপাত আমের নিবন্ধন পাওয়ার বিষয়টি শেষ পর্যায়ে। এটা হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষী ও সাধারণ মানুষের জন্য সম্মানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সাফল্য বয়ে আনবে।