এগিয়ে চলেছেন প্রতিবন্ধী সেলিম

53

ডি এম কপোত নবী, স্টাফ রিপোর্টর : ইচ্ছা শক্তি থাকলে যে কোন কাজে সফলতা অর্জন সম্ভব। কোন প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনা। এমনি একজন প্রতিবন্ধী যুবক মো. সেলিম রেজা। ৩ বছর বয়সে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন তিনি। স্বাভাবিক চলাচল করতে না পারলেও জীবন প্রতিযোগিতায় থেমে থাকেননি তিনি। নিজের ইচ্ছা শক্তি দিয়ে প্রতিভাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার সাথে একান্ত কথোপকথোনে জানতে পারি তার জীবনের কাহিনী ।
৫ ভাই বোনের মধ্যে সেলিম সবার বড়। বাবা কাজ করতেন আর মা সামলাতেন পরিবার। বাবা মার কর্ম ব্যস্ততার কারণে পোলিও টিকা খাওয়ানোর অভাবে ৩ বছর বয়সেই পোলিও রোগে আক্রান্ত হন সেলিম। এই পঙ্গুত্ব তার জীবনে অভিশাপ হয়ে নেমে আসে, ঠিক যেমনি রাতের আলোকিত পূর্নিমা চাঁদকে মেঘের আবছায় ঢেকে দেয়। কিন্তু চাঁদকে কালো মেঘ যতই ঢেকে রাখুক না কেন চাঁদ তার আলোয় আলোকিত হবেই এটাই বাস্তবতা। ঠিক তেমনি সেলিম তার প্রতিভা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে থাকে ছোট থেকেই। পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে স্বাভাবিক চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েন সেলিম। অন্য সবার মত দৌঁড় ঝাপ, খেলাধুলা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তার জীবন হয়ে পড়ে গৃহবন্দী। শারীরিকভাবে কিছুটা অস্বাভাবিক হওয়ায় কেউ তাকে পছন্দ করত না। আশেপাশের লোকজনও তাকে ঘর থেকে বের হতে বারণও করতো। সে অবাক দৃষ্টিতে চরম এক শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকতো আর চোখের জল ফেলত নিরবে। সে তখনও বুঝতে পারেনি কেন এমন হল তার জীবন ? কেন সে সবার চেয়ে আলাদা ? কেনই বা তাকে কেউ খেলার সাথী করে না ? আর জোটেনা কোন বন্ধু ? পায়ে ভর দিয়ে চলাচল করতে না পারায়, দুটো হাত তার সহায়ক হয়ে উঠে। প্রথম দিকে স্কুলে ভর্তি হতে না পারলেও অবশেষে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শুরু হয় তার শিক্ষা জীবন। সব সময় স্কুলে যেতে না পারলেও পড়ালেখায় সে বেশ ভালোভাবেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করেন। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিকে একাদশ মানবিক বিভাগের ছাত্র সেলিম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাসও করছেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি সংগীত চর্চা, কবিতা আবৃত্তি করেন তিনি।
সেলিম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনেকেই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে চায় না। আমরা নাকি সমাজের বোঝা মাত্র। আমাদের দিয়ে নাকি দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন কল্যাণকর কাজ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে আমাদের জন্য নেই কোন স্থানে বিকল্প ব্যবস্থা। চলাচলের ক্ষেত্রে হুইল চেয়ার দিয়ে সহজেই যে কোন স্থানে বা উঁচু ভবনে উঠার ব্যবস্থা নেই। স্কুল, কলেজ ও পরিবহনে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য নেই কোন সহজ ব্যবস্থা। নেই শৌচাগারের ব্যবস্থাও। আমি আপনাদের মাধ্যমে আবেদন রাখতে চাই অন্তত স্কুল ও কলেজগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষদের কথা চিন্তা করে যেন ব্যবস্থা করা হয়। যাতে আমাদের মত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনায়াসে পড়ালেখার জন্য সুযোগ পায়।
পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিলনা তার খরচ চালানো। তাই পড়াশোনা চালানো ও জীবন বাঁচানোর তাগিদে বিভিন্ন স্থানে টিউশনি করে নিজের সবকিছু চালান সেলিম। তবে ৬-৭ বছর আগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন অফিসারের সহায়তায় ব্যাটারি চালিত হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে দেয়া হয় সেলিমকে। সে হুইল চেয়ারেই চলাফেরা, কলেজ আসা যাওয়া করে সেলিম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চামাগ্রামে বাড়ি সেলিমের। কালি নগর উচ্চ বিদ্যালয় ও কারবালা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে এসএসসি সাফল্যের সাথে পাশ করেন। পরে সকলের সহায়তায় সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ভবিষ্যতে তিনি একজন শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখেন বলে জানান। সেলিমের ইচ্ছে কারো বোঝা নয় নিজের যোগ্যতা দিয়ে কাজ করতে চান। সমাজসেবা দপ্তর থেকে প্রতি মাসে ৭০০ টাকা করে প্রতিবন্ধী ভাতা পান তিনি। তার বাবা গোলাম মোস্তফা একজন হরেক মাল বিক্রেতা ছিলেন। বর্তমানে বয়সের কারণে সে কাজও করতে পারছেন না। কোন রকমে চলছে সংসার। সমাজসেবা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই চলছে পড়াশুনার খরচ বলে জানান সেলিম। পড়ালেখা চালিয়ে যেতে সমাজের বিত্তবানদের একটু সহায়তা চান তিনি।